অ্যাডমিশন ডে’র ইভনিং রাউন্ড। এটা কোল্ড ওয়ার্ড। চাপ কম। রোগীরা মোটামুটি ইমারজেন্সীর ঝড়ঝাপ্টা সামলে থিতু হলে এখানে ঠাঁই মেলে। রাত প্রায় দশটা। ঝক্ঝকে তরুণ রেসিডেন্ট সুদীপ্ত’র গলায় একটু যেন দ্বিধাজড়িত অনুরোধ। সতেরো নম্বর কেসটা আমার জানা। বছর তেইশের মেয়েটা দিনদুয়েক আগে সুইসাইড অ্যাটেম্পট করেছে। সিন্থেটিক ওড়নাটা ওর ওজনে ইলাস্টিকের মত ঝুলে পড়ায় পা’টা মাটিতে ঠেকে যায়, পার্শিয়াল হ্যাংগিং। তাই মৃত্যু না হলেও যা হয়েছে, সেটার থেকে বোধহয় প্রথমটা হলেই ভালো ছিলো। বেশ কিছুক্ষণ মস্তিষ্কে রক্তসরবরাহ ব্যাহত থাকায় সিভিয়ার ব্রেন ড্যামেজ হয়েছে। চেতনা আছে, তবে চৈতন্য চিরকালের জন্যে বিদায় নিয়েছে। এমনকি এটা কোমা’ও নয় যে ‘ব্রেন ডেড’ ডিক্লেয়ার করে বাড়ির লোকেদের ‘অঙ্গদানের’ ব্রতকথা শোনাবো। এ যা হল, তাতে যতক্ষণ না প্রকৃতি বা ঈশ্বর পরবর্তী পদক্ষেপটি নিচ্ছেন, ততক্ষণ ডাক্তার-পার্টি-রোগী, তিন তরফ’ই স্বর্গ-মর্ত্যের মাঝে ঝুলে থাকা পারফেক্ট মহারাজ ত্রিশঙ্কউ! এসব ‘আন-রিওয়ার্ডিং’ কেস ডাক্তার হিসেবে দেখতে কারোরই ভালো লাগেনা, আমারও নয়। একটা অসহায় পরাজয়ের গ্লানি যেন ব্যঙ্গ করতে থাকে- ‘তোরা যুদ্ধ করে করবি কি তা বল?’ তাই সুদীপ্ত’র অনুরোধ শুনে একটু অপ্রসন্ন ভুরু তুলে তাকাতে’ই ও চোখটা নামিয়ে নিল।
বলতে বলতে সুদীপ্ত আমার ক্রমবর্ধমান দ্রুতির সঙ্গে পা মেলায়।
অ্যাডমিশন ডে’তে ইভনিং রাউন্ডটা আসলে ঝাড়াই-বাছাই’এর তদারকি। যে সংখ্যায় বাঁধভাঙা জলস্রোতের মত ইমারজেন্সী দিয়ে পেশেন্ট ভর্তি হতে থাকে, তাতে সীমিত লোকবল আর প্রাগৈতিহাসিক পরিকাঠামো সম্বল করে সরকারী হাসপাতালে যা করতে হয়, তা হল যুদ্ধক্ষেত্রে ট্রায়াজ বা ঝাড়াই-বাছাই। যার মোদ্দা কথা হল, যাদের চিকিৎসা করে টেনে তোলা যাবে, তাদের দিকে যথাসম্ভব নজর দাও, আর যারা লস্ট বা প্রায় লস্ট কেস, তাদের ততটুকুই দাও যাতে পেশেন্ট-পার্টি ‘তুষ্ট’ না হলেও ‘রুষ্ট’ না হয়ে ওঠে। পরিকাঠামোর সর্বোচ্চ সদ্ব্যাবহার। নির্মম ইউটিলিটারিয়ানিজম্।
সুদীপ্ত আমার এই প্রোটোকলটা জানে, তাই এই প্রায় লস্ট কেস’টা নিয়ে ওর গলার সুরে এত দ্বিধা।
সতেরো নম্বর বেডের কাছে দু-একজন বাড়ির লোক। একজন নিঃসন্দেহে মা। বিধ্বস্ত। চোখেমুখে রাত্রিজাগরণের অভ্রান্ত অভিজ্ঞান। অপরজন বোধহয় দিদি বা বোন, বয়স আর মুখের আদল রোগীর সঙ্গে মেলে। আমাকে আসতে দেখে মেয়েটি একটু সরে দাঁড়ালো। মা’য়ের সে বোধ’ও লুপ্ত। সেটাই স্বাভাবিক। দ্রুত হাতে রোগীকে পরীক্ষা করে মেডিক্যাল নোট বলে গেলাম যন্ত্রের মত। সুদীপ্ত ‘ইয়েস স্যার, ইয়েস স্যার’ করে লিখে নিলো। দেখা শেষ করে পা বাড়াতেই সেই মেয়েটি এবং আশপাশ থেকে আরো দু-একজন পুরুষ আত্মীয় এগিয়ে এলেন। এঁদের এতক্ষণ দেখতে পাইনি, হয়ত আড়ালে ছিলেন। দেখেই বোঝা যায়, একান্ত সাধারণ ভদ্র মধ্যবিত্ত পরিবার। চোখেমুখে উচ্চশিক্ষা-উচ্চবিত্তের তাচ্ছিল্য কিংবা লুম্পেন-প্রলেতারিয়ান ক্ষমতার উগ্রতা, দুটোই অনুপস্থিত।
যেন বুঝতে চায় যে ঠিক কোন ঘটনার কার্য্য-কারণ সম্পর্কে প্রিয়জনের মৃত্যু এসে তার জীবনটা তছনছ করে দিল। অথচ প্রায় সবাই জানি, মৃত্যু সর্বক্ষণ আমাদের পাশে পাশেই ঘুরে বেড়ায় আর দুনিয়ার সব মৃত্যুর একটিই মাত্র সুনিশ্চিত কারণ মানুষের জানা আছে, তা হল- মানুষটির জন্ম হয়েছিলো!
যাইহোক, এখানে জানা গেল টিপিক্যাল ‘প্রেমে ল্যাং খাওয়া কেস’। কলেজে পড়া মেয়ে। মাঝারি মেধাবী ছাত্রী। শান্ত, চাপা স্বভাব। বছরকয়েক ধরে একটি ছেলের সঙ্গে ইত্যাদি, ইত্যাদি। কিন্তু যেটা একটু অস্বাভাবিক, সেটা হল ছেলেটির পরিচয় সে কাউকে জানায়নি। অতি সামান্য যেটুকু উদ্ধার করা গেছে, তাতে একটিই নাম পাওয়া যাচ্ছে - বাঁশি। মেয়েটির বোন জানালো, ছেলেটি ওর থেকে বছর চার-পাচেঁর সিনিয়র। একই কোচিং-এ পড়ার সূত্রে পরিচয়। ছেলেটি নাকি খুব সুন্দর বাঁশি বাজাতো। বুঝলাম, সেই থেকেই ‘রাধারানী’ মজেছেন। কিন্তু মজা হল, অসম্ভব লাজুক আর চাপা স্বভাবের মেয়েটি তার সেই প্রেমিকের প্রতি তীব্র প্রেমে যতই হাবুডুবু খাক, ছেলেটিকে সে কথা নাকি সে কখনই মুখ ফুটে বলতে পারেনি।
বোঝো কান্ড! এতো পুরো রাবীন্দ্রিক কেস। ল্যাং খাওয়ার অঙ্ক তো মিলছে না। আমার লজিক্যাল মন প্রায় রিফ্লেক্সেই প্রশ্ন করে ফেললো-
কপিবুক আকিউট ডিপ্রেশন। এসব ইন্ট্রোভার্ট পারসোন্যালিটির ছেলে-মেয়েদের খুব সমস্যা। আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্তের যুগে যদিও মনের জানলা খুলে কথা বলার অনেক উপায় হয়েছে আর জেন-ওয়াই’ও এসব ব্যাপারে অনেক বোল্ড, তা সত্বেও মনের গহনের অন্ধকারের সব খবর কেই বা জানতে পারে?
যাক সে কথা, কেসটা জেনুইন সিরিয়াস। আশা নেই বললেই হয়, রাতটা’ও কাটবে কিনা কে জানে? ব্রেন ড্যামেজের ব্যাপারটা বাড়ির লোকেদের আরো একবার যথাসম্ভব ব্যাখা করে একরকম ‘ডাক্তারে জবাব দেওয়া’-টা সেরে রাখলাম। আমরা সিনিয়র’রা এই কাজটা করে রাখি। এতে রাতবিরেতে হঠাৎ কিছু হলে, ‘স্যার তো আপনাদের আগেই বলেছিলেন’-এর সুরে জুনিয়রদের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুবিধে হয়। সব মিলিয়ে মনটা একটু ভারী’ই হয়ে গেল।
রাউন্ড শেষ হতে না হতেই রেড অ্যালার্ম। ইমারজেন্সী থেকে ফোন, ছ’নম্বর জাতীয় সড়কে একটা বরযাত্রীর বাস উল্টেছে, তৈরী থাকুন। ব্যাস ! হয়ে গেল! আজ রাত্রের মত বিশ্রামের দফা গয়া।
পরের কয়েকটা ঘন্টা কিভাবে কেটে গেল, বিশদ বলার কিছু নেই। একদিকে অপারেশন থিয়েটার, ব্লাড-ব্যাঙ্কে মুহুর্মুহু ফোন, ট্রলির ছোটাছুটি, জান্তব আর্তনাদ; আর অন্যদিকে? ছিন্নভিন্ন বেনারসী শাড়ি, রক্তমাখা ব্যান্ডেজ, ছেঁড়া সিল্কের পাঞ্জাবি’র ওপর দিয়েই কার্ডিয়াক ম্যাসেজ, রক্তাক্ত-অচৈতন্য, তরুণীর শরীরে অযাচিত-স্বেচ্ছাসেবী স্থানীয় যুবকের পাশবিক ‘হাতের সুখ’ কিংবা তারই মধ্যে মা’য়ের বয়সি মহিলার মাথা-থ্যাঁতলানো নিষ্প্রাণ শব থেকে নির্বিকার চিত্তে একঝটকায় গলার সোনার বিছেহারটা ছিঁড়ে নেওয়া-
মহারাজ যুধিষ্ঠির আর কটা নরক দর্শন করেছিলেন? সরকারী হাসপাতালে ডাক্তারদের ওটা নিত্যদর্শনীয়।
সবকিছু আয়ত্তে আসতে আসতে রাত গড়িয়ে ভোর। শেষরাতে সার্জেন’স রুমের সোফায় শরীরটা লম্বা হতে চোখদুটো একটু জুড়ে এসেছিল। ওয়ার্ডবয় দেবুর ‘স্যার’ ডাকে চোখ মেলে দেখি ঘড়িতে পাঁচটা। জানলার বাইরে অন্ধকার হাল্কা হতে শুরু করেছে। দেবুর হাতে চায়ের ট্রে, সঙ্গে একটা কল-বুক ফাইল। চা’য়ের ট্রে’টা টেবিলে রেখে ফাইলটা পাশে রাখতে জিজ্ঞেস করলাম-
যাক। গল্প তাহলে শেষ। কিন্তু পুলিশ ডেথ সার্টিফিকেট বলে কথা, সুদীপ্ত তো আমার সামনে বসেই লিখতে পারতো! একটু কমা-ফুলস্টপ এদিক-ওদিক হলেই পোস্টমর্টেম ঘেঁটে-ঘুঁটে ঝামেলার একশেষ হবে। নাঃ! ছেলেটা ব্রিলিয়ান্ট হলেও বাস্তববুদ্ধি বড় কাঁচা। একটু বিরক্ত হয়েই দেবু’কে বললাম-
বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত ছিটকে উঠে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড় লাগালাম কোল্ড-ওয়ার্ডের দিকে।
নাঃ! তিন দশক ডাক্তারী পড়িয়েও মানুষ আর তার আর দুর্গম অন্তরের অন্তর আমার অধরাই রয়ে গেল।।
অলংকরণ - নিলয় মজুমদার
Liked our work ?