Loading...

অনাবিল হাসি বা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের গল্প

কিংশুক বন্দোপাধ্যায়

লোকটা চেলো বাজাচ্ছে।

আপনমন। চোখবুজে। কিন্তু ঠোটের কোনায় লেগে আছে এক চিলতে হাসি। বিশ্ব সংসারে কোথায় কি হচ্ছে তা নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তার। সুরের মূর্ছনায় সে মগ্ন। অথচ সুরের বাইরে তার চারপাশের পৃথিবী কিন্তু অতি বাস্তব গদ্যময়। মার্চ শেষের শ্লগ ওভারেও শীত জমিয়ে ইউরোপে ব্যাট করছে  আর তা লোকটার শরীর ঢাকা কালো ওভারকোট দেখেই মালুম হচ্ছে। 

অথচ সুরের বাইরে তার চারপাশের পৃথিবী কিন্তু অতি বাস্তব গদ্যময়। মার্চ শেষের শ্লগ ওভারেও শীত জমিয়ে ইউরোপে ব্যাট করছে। আর তা লোকটার শরীর ঢাকা কালো ওভার কোটে দেখেই মালুম হচ্ছে। তা সেই কোট পরেইমুখে হাসি ঝুলিয়ে সে বসে পড়েছে ভাঙাচোরা ইট, কাঠ, লোহার স্তূপের উপর। কারন বসার মত তো সেখানে আর কিছু নেই। সত্যি বলতে কি মাঝবয়সী মানুষটার যাওয়ারও আপাতত কোনও জায়গা নেই। এই চেলো ছাড়া আর কোনও পার্থিব বস্তুও নেই তার।

কয়েক ঘন্টা আগে পর্যন্ত  কিন্তু সবই তার ছিল। বৃদ্ধ বাবা,মা, সমবয়সী স্ত্রী (ছোটবেলার ক্রাসকেই জীবনসঙ্গী হিসাবে বেছেছিল সে),  টিনএজার দুই প্রাণোচ্ছল ছেলেমেয়ে। কিয়েভের পূর্বপ্রান্তের এই মধ্যবিত্ত মহল্লা যেখানে বেশিরভাগই স্থানীয় সরকারি চাকরি করে সেখানে বিগত দশক ধরে সপরিবারে বাস তার। 

বিগত শতকের সোভিয়েত জমানার স্মৃতিচিহ্ন ইউক্রেন রাজধানীর যেসব জায়গায় রয়েছে তার মধ্যে এই মহল্লা অন্যতম। সোভিয়েত আমলে তৈরি করা ফ্ল্যাটবাড়িতেই বাস তার। আর ভাগ্যের এমনই পরিহাস সেই বাড়িতেই কিছুক্ষণ আগে রুশ ক্ষেপনাস্ত্র আছড়ে পড়ে এক লহমায় তার চেনাশোনা পৃথিবীটাকে মুছে দিয়েছে। 

ভাগ্যিস সে ফ্ল্যাটে তখন ছিল না। পাশের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে গিয়েছিল কয়েকটা জিনিস কিনতে। কানফাটানো শব্দে দৌড়ে বেরিয়ে এসে বিস্ফোরিত চোখে দেখে তার বিল্ডিং দাউ দাউ করে জ্বলছে। আঠারো তলা বাড়িটার সামনের দিকটা বোমার ঘায়ে উড়ে গিয়েছে। ফলে কেমন যেন ছাল ছাড়ানো পশুর মতো সে নগ্ন। সামনের দেওয়াল না থাকায় প্রতিটা ফ্ল্যাটেরই গৃহস্থালি বিশ্বের নজরের সামনে অবগুন্ঠনহীন। 

তার অবশ্য তখন অত দার্শনিক তত্ত্ব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। আগুন, আর্তনাদ আর স্তুপাকৃত কংক্রিটের কঙ্কাল কোনওমতে পেরিয়ে সে ছুটেছে তার দশ তলার ফ্ল্যাটের পানে। কিয়েভের উপর রুশ হামলা শুরু হওয়ার তো শহরশুদ্ধ গৃহবন্দী।  তাই সবারই তো বাড়িতে থাকার কথা।

 কোনওমতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে ফ্ল্যাটে গিয়ে অবশ্য ধ্বংসস্তুপ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়েনি। কেউ নেই। তাতে অবশ্য খানিকটা স্বস্তিই পেয়েছে। কারুর কোনও ক্ষতি হয়ত হয়নি। হয়ত বিপদ বুঝে অন্য কোথাও আশ্রয় নিয়েছে। ফলে ফ্ল্যাট আসলে ধ্বংসাবশেষের যাদুঘর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে হতাশা যখন গ্রাস করছে, তখনই চোখ পড়ল লাল চেলোটার দিকে।

ড্রইংরুমের যে স্ট্যান্ডের উপর চেলোটা ছিল, বিস্ফোরণের তোপে সেটা খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়ে রয়েছে। দেখেই বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। অতি প্রিয় বাজনাটা ঠিক আছে তো। দৌড়ে গিয়ে বাক্সটার ডালাটা খুলে ধড়ে প্রাণ এল। নাহ বাজনাটা ঠিক আছে। হঠাৎ যেন চারিদিকের আর্তনাদ, চিৎকার, রক্তের স্রোত, ধ্বংসলীলা, মিলিয়ে যেতে লাগল চোখের সামনে থেকে।

তারপর কখন যে নেমে এসেছে বাড়ির সামনের রাস্তায়, কখন যে চেলো তুলে নিয়েছে বাজানোর জন্য, তা সে নিজেই জানে না। জানে শুধু ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে দাঁড়িয়ে নীল আকাশের স্বপ্নে বিভোর হওয়া। এই পরমানন্দই পারে জাগতিক দুঃখ ভোলাতে।এই হাসি তাই মৃত্যুকে তুচ্ছ করে জীবনের জয়গান গায়।

মৃত্যূপুরীতে দাঁড়িয়ে জীবনের জয়গান গেয়েছেন যুদ্ধবিধস্ত খারকিভের ডেনিস কারাসেভ্টচেভের কথা। ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের এই বাসিন্দা কিন্তু এই সঙ্কটকালে লক্ষ লক্ষ লোকের মত দেশ ছেড়ে ভিনদেশের নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেননি। অথচ এ ব্যাপারে বিন্দু মাত্র ইঙ্গিত দিলেই অস্ট্রিয়া, জাপান, তুরস্কে কনসার্ট করা ডেনিসের দেশ বিদেশের অগণিত ভক্তরা তাঁকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যেত।

কিন্তু ডেনিস অন্য ধাতুতে গড়া। যে সময় রুশ হানাদার বাহিনীর বর্বরতার খবরে বেশিরভাগের শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের ঠাণ্ডা স্রোত নামছে, তখন জনশূন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডেনিস তাঁর চেলোতে সুরের ঝর্ণাধারা এনেছেন। তিউনিশিয়ার প্রাচীন এল জেম অ্যাম্পিথিয়েটারে যে যোশে তিনি বাজিয়েছিলেন, সেই একই একাগ্রতায় খারকিভের বোমাবিধস্থ পুলিশ সদর দফতরের সামনে ডেনিস তাঁর চেলোতে কখনও তুলেছেন বাখের ৫ নম্বর সোনাটার মূর্ছনা, কখনও বাজিয়েছেন ইউক্রেনের জাতীয় সঙ্গীত। ডেনিসের স্মিত হাসি আদতে  শত সহস্র হামলার মুখে দাঁড়িয়েও এক অতি প্রাচীন জাতির মাথা না নোয়ানোর  অদম্য জেদ।

ফেসবুকে ইংরেজি, ইউক্রেনীয় আর রুশ ভাষায় ডেনিস লিখেছেন,” আমি এক চেলো বাদক আর খারকিভ আমার শহর। যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত আমার শহর কিন্তু বাঁচতে চাইছে। আমি অন্তর থেকে জানি এই লড়াইয়ে আমরা সবাই হাত বাড়িয়ে দিতে পারি। যুদ্ধ একদিন না একদিন শেষ হবেই। তখন আমার শহর, আমার দেশকে আবার তুলে ধরতে হবে। আমি তাই শহরের রাস্তায় রাস্তায় বাজাচ্ছি। চেষ্টা করছি ত্রাণ তহবিল সংগ্রহ করতে, যাতে শহরের বাসিন্দাদের সুবিধা তো হবেই, শহরের ঐতিহ্যও রক্ষা করার রাস্তা খুলবে।“

আদতে ডেনিস মনে করাচ্ছেন বিগত শতকের ৯০ দশকের রক্তক্ষয়ী চার বছর ব্যাপী সারাজেভো অবরোধের সময় আরেক চেলোবাদক ভেদরান স্মাজলোভিককে। ভেদরানও ছিলেন অকুতভয়। বসনিয়ার রাজধানী ভিজেকনিকার ধ্বংস হয়ে যাওয়া সিটি হলে শত্রুর রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে তিনি বাজিয়েছেন। প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও বাজিয়েছেন সমাধি ক্ষেত্রে।

তবে শুধু ডেনিস বা ভেদরান নয়। ক্ষেপণাস্ত্র হানার আতঙ্ককে জয় করতে নিজের ফ্ল্যটের ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে পিয়ানোতে সঁপা বাজিয়েছেন ইরিনা মানিউকিনা। কিয়েভের ভূগর্ভস্থ আটকে পড়া মানুষদের চাঙা করতে বেহালা বাজিয়েছেন ভেরা লিতভচেঙ্কো।

এরকম শত শত ইরিনা, ভেরারা ইউক্রেন জুড়ে আজ ছড়িয়ে পড়ছেন। যত রক্তস্রোত বাড়ছে তত এরা সঙ্গীতের প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। তাই বুচার গণহত্যার বধ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে মনুষ্যতের সূর মূর্ছনা তুলছেন যাতে ক্ষণিকের জন্য হলেও সব কিছু ভুলে দগ্ধ ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত জীবন আনন্দ পায়।

কিংবা যু্দ্ধবিধস্ত খারকিভের বোমার ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত শপিং মলে হাসতে হাসতে নাৎসা গ্রাচেভা আর আন্তন সোকোলভেরপরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হওয়া।  রুশ হামলার আগে নাৎসা নার্স হিসাবে কাজ করতেন শহরের এক ক্যান্সার ক্লিনিকে। আন্তন হলেন এক হাসপাতালের চিকিৎসক। দুজনের পরিচয়, বন্ধুত্ব, প্রেম সেই কাজের জগৎ থেকেই। ঠিক ছিল এই বসন্তেই চার হাত এক হওয়ার। কিন্তু কালান্তক যুদ্ধ এসে পড়ল এর মধ্যে।। যুদ্ধের ভয়াবহতা যত বাড়তে লাগল তত আহতদের আর্তনাদে হাসপাতাল ভরে গেল। ক্রমে হাসপাতালের ওষুধের ভাঁড়ারও শূন্য হয়ে গেল। তখন দুজনে বেরিয়ে পড়লেন ওষুধ কেনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে। যাতে যে কোনওভাবে ওষুধ সংগ্রহ করা যায়।

এতসবের মধ্যেও কিন্তু ছাঁদনাতলায় যাওয়ার পরিকল্পনায় অটলই রইলেন দুজনে। খারকিভের মূল গীর্জা রুশ বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত। কুছ পরোয়া নেই। রীতিমত বিয়ের পোষাকে সজ্জিত হয়েই শহরের এক মলের মধ্যেই সেরে ফেললেন বিয়ে। আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব সহকর্মীদের তুমুল হাসি গান করতালির মধ্যে সেই মলে বিয়ে হল। 

তারপর তো তাঁদের গাড়ি করে মধুচন্দ্রিমায় যাওয়ার কথা। মানে স্বাভাবিক সময় হলে সেটাই হত। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কি করে আর সেটা হবে? তবে তাও নাৎসা আর আন্তন হাল ছাড়লেন না। মলের পার্কিংয়ে থাকা এক বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ গাড়ির বনেটে প্রতীকি দাঁড়ালেন তাঁরা। সমবেত হাসি আর গানের মধ্যে নবদম্পতির প্রথম নাচও হল। 

যুদ্ধের মধ্যেই গাঁটছড়া বাঁধলেন কেন? ‘কাল হো না হো’ স্টাইলে নাৎসার উত্তর,”যুদ্ধের সময় শুধু আজই থাকে।“

অবশ্য এই প্রত্যয়ের উৎস খুঁজতে খুব বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই। দেশের ৪৪ বছরের তরুন প্রেসিডেন্ট ভোলোদোমির ওলেকজান্দ্রোভিচ জেলেনস্কিই তো আছেন। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির পুতিনের সবুজ ফৌজ যখন ক্রিমিয়া দখল করল, তখন টিভি দুনিয়ার সুপারস্টার কমেডিয়ান জেলেনস্কি কিন্তু চুপ করে বসেছিলেন না। বরং ফ্রন্টে চলে গিয়েছেন তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে। প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও ‘ওপেন এয়ার লাইভ’ কমেডি শো করেছেন ফৌজের মনোরঞ্জনের জন্য। বলেছেন,”মৃত্যুকে পরোয়া করে না তো একমাত্র হাসিই।“

অ্যাড্রিয়ান জোসেফ ক্রোনারকে মনে আছে? ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ১৯৬৫ সালে ক্রিট থেকে সায়গনে উড়ে আসা মার্কিন সেনাবাহিনীর রেডিওর রেডিও জকি যার ভোর ৬টার ‘ডন বাস্টার’ অনুষ্ঠান শুরুই হত ‘গু………ড…… মর্নিং ভিয়েতনাম’ বলে। অনুষ্ঠানটা এতই জনপ্রিয় হয় যে  ১৯৮৭ সালের হলিউড ‘গুড মর্নিং ভিয়েতনাম নামে এক সুপারহিট ছবিও বানিয়ে ফেলে।  ব্যারি লেভিনসন পরিচালিত এই ছবিতে ক্রোনারের ভূমিকায় অভিনয় করেন রবিন উইলিয়ামস।

তবে এক্ষেত্রে সবার আগে যার কথা মনে পড়ে তিনি হলেন ইঙ্গ-মার্কিন কমেডিয়ান বব হোপ। ইঙ্গ-মার্কিন ফৌজের মনোবল বাড়াতে, তাদের বিনোদন দিতে সারা বিশ্বের যুদ্ধক্ষেত্রে বারংবার ছুটে গিয়েছেন হোপ। তা সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্লিনই হোক বা  ভিয়েতনাম যুদ্ধের সায়গন। গিয়েছেন দক্ষিন প্রশান্ত মহাসাগরের মার্কিন নৌঘাঁটিতে। গিয়েছেন ইউরোপে ফ্রন্টলাইনের ট্রেঞ্চে। আরেক মার্কিন কমেডিয়ান স্টিফেন কোলবার্টও বারংবার ছুটে গিয়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে ফৌজকে চাঙা করতে।

যুদ্ধবিধস্ত কিয়েভের ন্যাশানাল প্যালেস অফ আর্টস এ মার্কিন কমেডিয়ান লুইস সি কে-র অনুষ্ঠান অবশ্য বাতিল হয়েছে। ইউরোপ ট্যুরের অংশ হিসাবে লুইসের কিয়েভে আসার কথা ছিল। কিন্তু ইউক্রেনের আকাশ ‘নো ফ্লাই জোন’ হওয়ায় লুইস আপাতত তার যাওয়া স্থগিত রেখেছেন।

কিন্তু ‘ওহাইয়ো গোজাইমাসু ইউক্রেন’ (ইউক্রেন ভাষায় গুড মর্নিং ইউক্রেন) শোনা যে কেবল সময়ের অপেক্ষামাত্র তা বলাই বাহুল্য।

 


Liked our work ?